অলক্ষিত সীমানা

গতকাল রাতে এসে পৌঁছেছি হিলিতে। আগের দিন গোসল করার কোন উপায় ছিলনা। খানিক পর পর মাথায় একটা তীক্ষ্ণ ব্যাথা জানান দিয়ে যাচ্ছে। গত রাতে বহু অনুনয় করার পর হোটেলের বয় ছোট্ট একটা পাতিলে গরম পানি এনে দিল। ঐ পানি দিয়ে কেবল গা ধোয়া চলল গোসল আর হলনা। অগত্যা গায়ে পানি দেয়া গেসে সেই খুশি নিয়ে বিছানায় যেতে হল। আটজন সদস্যের জন্য আলাদা আলাদা ঘর। আমার কামরাটা বিশাল। দুই প্রান্তে দুটো বিছানা পাতা। হিলিতে তাপমাত্রা দেখাচ্ছিল ১৩/১৪ ডিগ্রি শুনলাম। আবিষ্কার হল সেটা ভুল। ১৩/১৪ ডিগ্রিতে এত ঠাণ্ডা হবার কথা না। দুই পরতে শীতের কাপড় পরেছি। বাতি নিভিয়ে লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে পরলাম। গুটি শুঁটি মেরে চোখ বন্ধ করে আছি। দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আমার! এক ফোটা ঘুমের সুযোগ হেলায় নষ্ট করা যাবেনা। গোটা দুনিয়ার মানুষ না ঘুমিয়ে, না গোসল করে কাজ করতে পারে পারুক, আমি পারিনা। সবসময় সেটা দরকারও মনে করিনা। তো আমি ঘুমের চেষ্টা করছি চোখ বন্ধ করে। কেমন যেন ভুতুড়ে, মফস্বলী আবহ। ভুল বললাম। মফস্বলী আবহ না এটা তো সেই ছোটবেলায় ফেলে আসা মফঃস্বলগুলোই। যার সাথে ঢাকায় আসার পর সারাজীবনের নামে একটা বিচ্ছেদ তৈরি হয়। সেই ছোটবেলার মফঃস্বলে, স্মৃতির উপশহরে আবার ফিরে আসলাম। কেমন যেন অস্বস্তি জাগানো একটা অনুভূতি। আমি তো ভেবেছিলাম আমার জীবনের ঐ অংশটার সাথে আমার বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। আমার ছোটবেলার ঐ স্মৃতিগুলোর সাথে কেমন যেন একটা প্যাচ পেঁচে রোমাঞ্চকর সম্পর্ক ছিল। ভাবতাম কোন একদিন আমি ঐ শহরগুলোতে ফিরে যাব কিন্তু আক্ষরিক অর্থে কোনদিন যেতে পারবো ভাবিনি, সত্যি কথা হল সেভাবে চাইও নি। এখনো সেই অতীতে ফিরে আসতে পারার অনুভূতিটা ভেতরে ঠিক গেড়ে বসতে পারেনি। খানিক পর পর কেবল হতচকিতের মত মনে পরে যায় যে আমি আমার অতীতে ফিরে এসেছি, সশরীরে! ঠাণ্ডা, অন্ধকার ঘর। আমার পাশের বিছানাটা খালি। হোটেলের পাশে রাস্তা। তার পাশের একটা ফাকা জমিতে নির্মান কাজ চলছে। চোখ বুজে ট্রাক থেকে মালামাল নামানোর শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পরলাম।

মাথার দিকের রাস্তায় ট্রাকের হর্নে ঘুম ভেঙ্গে গেল। চারদিকে শুনশান নীরবতা। খানিক পর পর রাস্তায় ট্রাক আর লরি যাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। কম্বলটা টেনে ঠিক করতে গিয়ে পাশের জানালার দিকে চোখ গেল। হিয়া সম্ভবত পর্দা সরিয়ে ঘুমায়। জানালার পাশের বিছানায় শোয়ার মধ্যে একটা রোম্যান্টিক ব্যাপার আছে যেটা হয়তো ওর বয়সেই ভালো লাগার কথা। জানালার কাঁচে কুয়াশা। অন্ধকার, কুয়াশা ভেদ করে জানালা গলে যতটুকু আলো এসে পরছে তাতে হিয়ার মুখের উপরে থাকা ছায়া আরও গভীর হয়। কি অদ্ভুত একটা অসহায় অভিব্যক্তি ওর ঘুমন্ত মুখে। কেবল হাতে পায়ে বেড়েছে মেয়েটা। কম্বলের ওম, নিজেদের শরীরের তাপ, কুয়াশা ঢাকা ভোরের নীরবতা সবকিছু মিলে মিশে একটা আরামদায়ক উষ্ণতা গোটা ঘর জুড়ে। হঠাৎ মনে পরে গেল আমি হিলিতে। একটা সতর্ক বার্তা মগজ থেকে শরীরে পৌছাতে পৌছাতেই আমার পাশে হিয়ার ঘুমন্ত অসহায় মুখটার দিকে চোখ গেল আবার। নাহ… সবকিছু ঠিক আছে, কোন ভয় নেই, আমি ঢাকায়, আমার বাসায়।